ট্রাইব্যুনালের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ- সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আবেদন

26 Nov

সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আবেদন

ট্রাইব্যুনালের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক
১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের লক্ষ্যে গঠিত ট্রাইব্যুনালের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ এনে একটি আবেদন দায়ের করেছেন যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আটক বিএনপি স’ায়ী কমিটির সদস্য অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী। আবেদনে তিনি বলেন, এই ট্রাইব্যুনালের সব কার্যক্রম, সব আদেশ নির্দেশ ও সব বিধিবিধান অবৈধ ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল। এই আদালত কর্তৃক তাকে আটক রাখাও অবৈধ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
গত বুধবার ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা আবেদনে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, গত ৩ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়া সংশোধিত সংবিধানে রাষ্ট্রদ্রোহের বিষয়ে যে বিধান (৭-ক) রাখা হয়েছে তাতে বাংলাদেশের সব কিছুই এখন রাষ্ট্রদ্রোহের মধ্যে পড়ে। তার মধ্যে এই ট্রাইব্যুনালও রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের যে দু’জন বিচারপতিকে এই ট্রাইব্যুনালে নিয়োগ দেয়া হয়েছে তাও সংবিধান অনুযায়ী অবৈধ।
আবেদনে তিনি বলেন, যেহেতু এই আদালতের সব কার্যক্রম রাষ্ট্রদ্রোহিতার পর্যায়ে পড়ে তাই এই আদালতের বিচারকাজে অংশ নেয়ার মাধ্যমে তিনি নিজে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মধ্যে জড়াতে চান না। সংবিধানের সাত (ক) ধারায় বলা হয়েছে সংবিধান লঙ্ঘন করা রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল। এই ট্রাইব্যুনালের গঠন হয়েছে সংবিধান লঙ্ঘন করে।
তিনি বলেন, ২০০৯ সালে ১৯৭৩ সালের আইনে যে সংশোধনী আনা হয়েছে তাও অবৈধ।
সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, এই ট্রাইব্যুনালে তিনজন বিচারপতির মধ্যে দু’জন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি। তারা হলেন- ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক ও অপর বিচারপতি এ টি এম ফজলে কবির। সংবিধানের ৯৪ (৩) ধারা মতে, প্রধান বিচারপতি ও আপিল বিভাগের বিচারপতিরা আপিল বিভাগে বসবেন। সুপ্রিম কোর্টের অন্য বিচারপতিরা হাইকোর্টে বসবেন।
তিনি বলেন, সংবিধানের এই ধারা মোতাবেক হাইকোর্টের বিচারপতিদের হাইকোর্টের বাইরে অন্য কোথাও বসার বিধান নেই। কিন’ সংবিধানের ৯৪ (৩) ধারা লঙ্ঘন করে অবৈধভাবে এই দুই বিচারপতিকে ট্রাইব্যুনালে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এই দুই বিচারপতিকে হাইকোর্টের বাইরে ট্রাইব্যুনালে নিয়োগ দিয়ে ২০১০ সালের ২৫ মার্চ আইন মন্ত্রণালয় থেকে যে গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে তা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রতি যেমন চরম আঘাত, তেমনি সংবিধানেরও লঙ্ঘন।
সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী আবেদনে বলেন, ২০০৯ সালে ১৯৭৩ সালের আইনের যে সংশোধনী পাস করা হয়েছে তাও সংবিধানবিরোধী এবং অবৈধ। ১৯৭৩ সালের আইনটি করা হয়েছিল পাকিস্তানি ১৯৫ জন সেনাকর্মকর্তার বিচারের জন্য। আইনের মাধ্যমে পাকিস্তানি আর্মড ফোর্সেস বা ডিফেন্স এবং অক্সিলিয়ারি ফোর্সের সদস্যদের বিচারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন’ তিনি নিজে ওই জাতীয় কোনো বাহিনীর সদস্য ছিলেন না। অথচ ২০০৯ সালে যে সংশোধনী আনা হয়েছে তাতে ‘ইন্ডিভিজুয়াল’, ‘গ্রুপ অব ইন্ডিভিজুয়াল’ এবং ‘অর্গানাইজেশন’ শব্দগুলো যোগ করা হয়েছে। এই সংশোধনীটি সংবিধানের ৩৫ (১) ধারারবিরোধী। কারণ ৩৫ (১) ধারায় বলা হয়েছে পরে আইন করে পূর্বের অপরাধের বিচার করা যায় না। অপরাধ করার সময় আইনে ওই অপরাধের জন্য যে শাস্তির বিধান ছিল পরে আইন করে তার বেশি বা অন্যরূপ শাস্তি দেয়া যাবে না।
২০০৯ সালের পিলখানা হত্যাযজ্ঞ বিষয়ে আপিল বিভাগ ২০০৯ সালের ৩ সেপ্টেম্বর যে মতামত দিয়েছিল তাও লঙ্ঘন করা হয়েছে ১৯৭৩ সালের আইনের সংশোধনীর মাধ্যমে। তিনি বলেন, ১৯৭৩ সালের আইনটি সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। আইনটি পাস করা হয় ১৯৭৩ সালের ২০ জুলাই। কিন’ আইনটি সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ার কারণে সংবিধানে প্রথম সংশোধনী এনে এর বৈধতা দেয়া হয়। আইনটি পরে হলেও সংবিধান সংশোধনীকে পূর্ববর্তী সময় থেকে কার্যকারিতা দিয়ে এ বৈধতা দেয়া হয়। প্রথম সংশোধনীতে ৪৭ (ক) এবং ৪৭ (৩) নামে নতুন দু’টি অনুচ্ছেদ যুক্ত করা হয়।
তিনি বলেন, ২০০৯ সালে সংশোধিত ১৯৭৩ সালের আইনে যে অসঙ্গতি ছিল তা দূর করার লক্ষ্যে আবার সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে ২০১১ সালে। ২০১১ সালের ৩ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়া নতুন সংবিধানে ‘ইন্ডিভিজুয়াল; এবং গ্রুপ অব ইন্ডিভিজুয়াল’ শব্দ যোগ করা হয়।
সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী আবেদনে বলেন, ট্রাইব্যুনালের অধীনে গত ১১ মাস তাকে আটক রাখা হয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে ২৩টি আবেদন দেয়া হয়েছে কিন’ তার একটিও আদালতে পৌঁছানো হয়নি। সংসদে যোগ দেয়া, তার বিরুদ্ধে শারীরিক নির্যাতনের তদন্ত দাবিসহ বিভিন্ন বিষয়ে সুরাহা চেয়ে আবেদন করা হয়েছিল। তিনি বলেন, আমি একজন সংসদ সদস্য, অথচ বর্তমান অবস’ায় এলাকার কোনো উন্নয়ন কাজের কোনো কাগজপত্র স্বাক্ষর করা যাচ্ছে না। তাকে আটক রাখাকে অবৈধ ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যমূলক আখ্যায়িত করে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, এর মাধ্যমে সংবিধানের মৌল কাঠামোর ক্ষতি করা হয়েছে। যুদ্ধাপরাধ আইনকে সংবিধানের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ করার জন্য ২০১১ সালের ৩ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়া সংবিধানে যে সংশোধনী আনা হয়েছে তার মাধ্যমে বাংলাদেশের সব নাগরিকের মৌলিক অধিকার হরণ করা হয়েছে।
সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী তার আবেদনে বলেন, সংবিধানের ২৬ (২) ধারায় বলা হয়েছে ‘রাষ্ট্র এই ভাগের কোন বিধানের সহিত অসামঞ্জস্যপূর্ণ কোন আইন প্রণয়ন করিবেন না এবং অনুরূপ কোন আইন প্রণীত হইলে তাহা এই ভাগের কোন বিধানের সহিত যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ ততখানি বাতিল হইয়া যাইবে।’ ১৯৭৩ সালের আইনে ২০০৯ সালে যে সংশোধনী আনা হয়েছে তা এই ধারা এবং ৭(২) ধারার পরিপন’ী।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: