আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সা. কাদের চৌধুরী : আমি রাজাকার নই, আজরাইলের ভয় দেখিয়ে লাভ নেই

30 Nov

http://www.amardeshonline.com/pages/details/2011/11/30/120164

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সা. কাদের চৌধুরী : আমি রাজাকার নই, আজরাইলের ভয় দেখিয়ে লাভ নেই

মানবতাবিরোধী অপরাধের কথিত অভিযোগে আটক বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী গতকাল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বলেছেন, মরহুম শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ধরে নিয়ে গিয়েছিল। তার গায়ে একটি আঁচড়ও তারা দেয়নি। আমি ৩২ বছর ধরে সংসদ সদস্য। আমার গায়ে হাত দেয়ার স্পর্ধা বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোথায় পেল? তিনি ট্রাইব্যুনালকে উদ্দেশ করে বলেন, আমাকে আজরাইলের ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। ‘আমি রাজাকার নই, কোথাও আমার নাম ছিল না। মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীন হঠাত্ ক্ষমতায় এসে আমাকে যুদ্ধাপরাধী বানিয়ে দিল। ফজলুল কাদের চৌধুরীর ছেলে হওয়ার কারণে আমি আজ ধরা খেয়েছি। তিনি আরও বলেন, আমার ফাঁসিও হতে পারে।
কিন্তু আমি কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করছি। যদি ট্রাইব্যুনালের রায়ে এসব প্রশ্নের জবাব পাই তবে সন্তুষ্টি নিয়ে মরতে পারব। তিনি আরও বলেন, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর ৭ (ক) অনুযায়ী কেউ যদি সংবিধান লঙ্ঘন করে অথবা সংবিধানের প্রতি জনগণের আস্থা নষ্ট করার উদ্যোগ নেয় তবে তিনি রাষ্ট্রদ্রোহিতার জন্য দোষী হবেন। তিনি বলেন, এটি আন্তর্জাতিক আদালত। কিন্তু আপনার সামনে একটি মাইক্রোফোন ছাড়া আর কিছুই আন্তর্জাতিক মানের দেখতে পাচ্ছি না।
গতকাল সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনে ওই মামলা স্থগিত চেয়ে আবেদনের শুনানিকালে এসব কথা বলেন। শুনানি আজ বুধবার পর্যন্ত স্থগিত করেছে ট্রাইব্যুনাল।
গতকাল বেলা ১১টা ১০ মিনিটে এ আবেদনের শুনানি শুরু হয়। এর আগে সকাল সাড়ে দশটায় সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার থেকে একটি প্রিজনভ্যানে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। গত ২৪ নভেম্বর এ পিটিশন দাখিল করেন তিনি। গতকাল এর শুনানির তারিখ নির্ধারিত ছিল। এদিকে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী নিজেই আবেদনের শুনানিতে অংশ নেন। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী প্রথমে ৫৬ দফা পিটিশন পড়ে শোনান। এরপর আধঘণ্টার বেশি তিনি বক্তব্য দেন। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী চেয়ারম্যানকে উদ্দেশ করে বলেন, আপনি সফলভাবে আমার আইনজীবীদের তাড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন। তাদের একজনের বিরুদ্ধে এরই মধ্যে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা হয়েছে। তিনি জামিন নিতে গেছেন। আমি নিজেই শুনানি করব। তখন ট্রাইব্যুনাল বলেন, আমরা কিভাবে আপনার আইনজীবীদের তাড়িয়ে দিয়েছি? জবাবে সালাহউদ্দিন কাদের বলেন, আপনি আমার ৩৫ জন আইনজীবীকে ট্রাইব্যুনালে প্রবেশ করতে দেননি। তখন ট্রাইব্যুনাল বলেন, আমরা তো বলেই দিয়েছি ১০ জনের বেশি প্রবেশ করতে পারবেন না। জবাবে সালাহউদ্দিন কাদের বলেন, কোন আইন বলে আপনি এটা করেছেন। ওই সময় ট্রাইব্যুনাল এ সংক্রান্ত রুলস দেখান। তখন তিনি বলেন, আইন লঙ্ঘন করে কোনো রুলস হতে পারে না। হাত-পা বেধে সাঁতার কাটা যায় না। তখন ট্রাইব্যুনাল বলেন, মি. চৌধুরী, এটা কোনো ফানি প্লেস না। এটা আদালত। সালাহউদ্দিন কাদের দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, আমি আপনাদের শুভাকাঙ্ক্ষী। আপনাদের বিরুদ্ধে আমার কোনো অভিযোগ নেই। আপনাদের দু’জন হাইকোর্টের বিচারপতি। আরেকজন হাইকোর্টের বিচারপতি হওয়ার যোগ্য। আপনাদের প্রতি আমি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। এ সময় আদালতের কাছে এ শুনানিতে ড. কামাল হোসেনের মতো অ্যামিকাস কিউরি নিয়োগেরও দাবি জানান তিনি। একপর্যায়ে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী আদালতে বলেন, আমার বক্তব্য রেকর্ড হচ্ছে কিনা? চেয়ারম্যান বলেন, ‘না, এখনও হচ্ছে না’। তখন সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, এটি আন্তর্জাতিক আদালত। কিন্তু আপনার সামনে একটি মাইক্রোফোন ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। বিবিসির খবরে শুনেছি, একজন প্রশ্ন তুলেছে, এই ট্রাইব্যুনাল কোনো আদালত কিনা। এরপর তিনি বলেন, এটি যদি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আদালত হয়ে থাকে তাহলে দেশের অন্যান্য বিচারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কার্যপ্রণালী বিধি মানতে হবে।
তিনি চেয়ারম্যানকে লক্ষ্য করে বলেন, ‘স্যার, আজকের পত্রিকায় দেখলাম, ১৯৯৪ সালে গণআদালতের গণতদন্ত কমিশন সেক্রেটারিয়েটে আপনার নাম ছিল। কিন্তু রাজাকার, আল-বদর, আল-শামসসহ পাকিস্তানের কোনো সশস্ত্রবাহিনী বা সহায়ক বাহিনীতে আমার নাম ছিল না। তবে একটি জায়গায় আমি ধরা খেয়ে গেছি। ওই যে পিতার কোলে আমার জন্ম হয়েছে, যিনি আমার জন্মের পর খাসি দিয়ে আমার আকিকা করেছিলেন, ওইখানেই আমি ধরা খেয়েছি। নতুবা আমার চাচাতো বোনের (শেখ হাসিনা) সঙ্গে আমার কোনো শত্রুতা ছিল না। অথচ মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীন হঠাত্ ক্ষমতায় এসে আমাকে যুদ্ধাপরাধী বানিয়ে দিল। ‘আমি রাজাকার নই, কোথাও আমার নাম ছিল না।’
তিনি বলেন, হাইকোর্টের বিচারকদের অন্তর্নিহিত ক্ষমতা রয়েছে। তারা যেখানেই যান সেখানেই তাদের এ ক্ষমতা থাকে। অতীতে সিলেট রেলওয়ে স্টেশনে একজন বিচারপতি আদালত বসিয়েছিলেন। গাড়িতে পতাকা দেখার পরও স্যালুট না করায় পুলিশের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননা রুল হয়েছিল। এতে প্রমাণ হয় অন্তর্নিহিত ক্ষমতা সবখানেই প্রয়োগ করা যায়। তিনি বলেন, ১৯৭৩ সালে সংবিধানে ৪৭ অনুচ্ছেদ সংযুক্ত হয়েছিল। ওই বছরই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন পাস হয়েছিল। ওই আইন পাসের প্রায় ৩৬ বছর পর ২০০৯ সালে আইনের সংশোধন হয়। এতে ব্যক্তি ও ব্যক্তিবর্গ শব্দ সংযুক্ত হয়। এ সংশোধনীর মাধ্যমে ১৫ কোটি মানুষের মানবাধিকার খর্ব করা হয়েছে। অসত্ রাজনৈতিক উদ্দেশে এটা করা হয়েছে। এটি সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদের পরিষ্কার লঙ্ঘন। আর এর দুই বছর পর সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ব্যক্তি ও ব্যক্তিবর্গ শব্দগুলোকে সুরক্ষা দেয়া হয়েছে। এ যেন আগে সন্তান হয়ে গেছে। পরে সন্তানকে জায়েজ করার জন্য বাবার বিয়ে হলো। তিনি বলেন, সংবিধানের ৯৪(৩) অনুচ্ছেদ বলছে, প্রধান বিচারপতি ও আপিল বিভাগের অন্য বিচারপতিরা আপিল বিভাগে এবং হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিরা হাইকোর্টে আসন গ্রহণ করবেন। সংবিধান অনুযায়ী আপনারা হাইকোর্টে আসন গ্রহণ করবেন। অথচ আপনারা ট্রাইব্যুনালে আসন গ্রহণ করছেন। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর ৭ (ক) অনুযায়ী, কেউ যদি সংবিধান লঙ্ঘন করে অথবা সংবিধানের প্রতি জনগণের আস্থা নষ্ট করার উদ্যোগ নেয় তবে তিনি রাষ্ট্রদ্রোহিতার জন্য দোষী হবেন। সংবিধানের এ বিধান বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। একথা বলতে খুবই বিব্রত যে, আমি এ ট্রাইব্যুনালের বিচারক এবং ট্রাইব্যুনালে যারা আছেন সবাই রাষ্ট্রদ্রোহিতার জন্য দোষী। এসব কথা বলতে আমি খুবই বিব্রত। কারণ, আমি ফজলুল কাদের চৌধুরীর সন্তান। যিনি মরহুম শেখ মুজিবুর রহমানের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আইনজীবী ছিলেন।
সালাহউদ্দিন কাদের বলেন, সংবিধান লঙ্ঘন করে ট্রাইব্যুনালের আইন সংশোধন হয়েছে। আইন লঙ্ঘন করে বিধি তৈরি করা হয়েছে। সংবিধানের ২৬(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো আইন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলে তা বাতিল হয়ে যাবে। তার জন্য কোনো ঘোষণার প্রয়োজন হবে না। তিনি বলেন, লাখো শহীদের বিনিময়ে স্বাধীন হয়ে গেছে একথা বায়তুল মোকাররমে বলা যায়। আদালত, এখানে একথা বলা যায় না। এখানে কথা বলতে হবে আইন ও যুক্তির ভাষায়। তিনি বলেন, আমি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছি। আমার শপথে সংবিধান রক্ষার কোনো কথা বলা নেই। কারণ, সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংশোধনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দিতে হয়। কিন্তু আপনারা, বিচারপতিরা সংবিধানের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধানের শপথ নিয়েছেন। নিয়তির নির্মম পরিহাস এই যে, আপনাদের শপথ রক্ষার্থে আমাকে আবেদনপত্র দিতে হয়েছে। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, আমার ওপর নির্যাতন হয়েছে। যা আগেই বলেছিলাম। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সেই স্পর্ধা কোথায় পেল তার জবাবের ভার আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ট্রাইব্যুনাল ও দেশের জনগণের ওপর ছেড়ে দিলাম।
সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, এতো তাড়াহুড়ার কিছু নেই। আমার আবেদন হয়তো খারিজ হবে। ট্রাইব্যুনাল বলেন, আপনার আইনজীবীকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল প্রসিকিউশনের জমা দেয়া ডকুমেন্ট নিয়ে যেতে। কিন্তু তা নেয়া হয়নি। জবাবে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, আপনি চেম্বারে বসে আমার মামলা আমলে নেয়ার আদেশ দিয়েছেন। সেটা আপনার ও প্রসিকিউশনের প্রাইভেট ম্যাটার। আমি মামলা আমলে নেয়ার ব্যাপারে আবেদন দিয়েছি। সে আবেদন নিষ্পত্তি না করা পর্যন্ত আমি কোনো ডকুমেন্ট নেব না। ট্রাইব্যুনাল বলেন, ডকুমেন্ট না নিলে আপনারই ক্ষতি। তিনি ট্রাইব্যুনালকে উদ্দেশ করে বলেন, আপনার চুল সাদা হয়ে গেছে, আর আমার চুল তো পড়ে গেছে। ৬৩ বছর বয়স হয়ে গেছে আমার। তাই আমাকে আর আজরাইলের ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। এরপর সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর কাছে আদালত জানতে চান, তার আর কত সময় প্রয়োজন। তিনি তখন আরও চার-পাঁচ ঘণ্টা সময় লাগবে বলে উল্লেখ করেন। আদালত বিরতির পর আবারও শুনানি করতে চাইলে তিনি অসুস্থতার জন্য তাতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে আদালত আজ সাড়ে দশটায় আবার শুনানির সময় নির্ধারণ করেন।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: