সিমলা চুক্তি ও যুদ্ধাপরাধীদে র বিচার :: নয়াদিগন্ত

5 Dec

http://www.dailynayadiganta.com/details/14641

সিমলা চুক্তি ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার

॥ এবনে গোলাম সামাদ ॥

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সিমলা চুক্তি সম্পাদিত হয় ১৯৭২ সালের ৩ জুলাই। ১৯৭১ সালে ডিসেম্বর মাসের ১৭ দিনজুড়ে হয় ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ। এতে তদানীন-ন পূর্ব
পাকিস্তানে জয়ী হয় ভারত। হারে পাকিস্তান। ভারতের হাতে বন্দী হয় প্রায় ৯৩ হাজার সৈন্য। সিমলা চুক্তি অনুসারে এই ৯৩ হাজার যুদ্ধ বন্দীদের (POW) পাকিস্তানের হাতে ছেড়ে দেয়া হয়। এদের কাউকেই যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিচার করা হয় না। এ ছাড়া সিমলা চুক্তিতে ভারত ও পাকিস্তান উভয়ই রাজি হয় যে, ভবিষ্যতে তাদের মধ্যে কোনো বিরোধ দেখা দিলে তার নিষ্পত্তি করতে হবে আলোচনার মাধ্যমে, কোনো যুদ্ধের মাধ্যমে নয়। চুক্তিটির নাম হয় সিমলা চুক্তি। কারণ এটি সম্পাদিত হয় ভারতের হিমাচল প্রদেশের রাজধানী সিমলা শহরে। সিমলায় ভারত ও পাকিস্তান এই দুই দেশরে প্রতিনিধিরা চুক্তির আগে দিয়ে করেন আলোচনা সভা, যা ইতিহাসেখ্যাত হয়ে আছে সিমলা সম্মেলন হিসেবে। এই সম্মেলনে ভারতীয় পক্ষের নেতৃত্ব দেন ভারতের তদানীন-ন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী। আর পাকিস্তানের পক্ষের নেতৃত্ব করেন তদানীন-ন প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ জুলফিকার আলী ভুট্টো। এই সম্মেলনে বাংলাদেশকে ডাকাই হয়নি। বাংলাদেশকে ডাকা হয়নি এর একটা কারণ ছিল, জুলফিকার আলী ভুট্টোর আপত্তির কারণে। ভুট্টো আপত্তি তোলেন, ১৯৭১-এর যুদ্ধ হয়েছে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে। বাংলাদেশ নামে তখন কোনো রাষ্ট্র ছিল না।
পাকিস্তান বাংলাদেশের সাথে কোনো যুদ্ধ করেনি। যুদ্ধ করেছে ভারতের সাথে। ঢাকায় রমনার মাঠে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলের সেনাপতি লেফটেন্যান্ট জেনারেল এ এ কে নিয়াজী ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণ করেন কেবল ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে। তিনি মুক্তিযুদ্ধের কোনো সেনানায়কের কাছে পৃথকভাবে আত্মসমর্পণ করেননি। তাই সিমলা সম্মেলনে বাংলাদেশের কোনো প্রতিনিধি থাকতে পারে না। যুদ্ধ বাংলাদেশ-পাকিস্তানের মধ্যে হয়নি। হয়েছে কেবল ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে। জুলফিকার আলী ভুট্টোর কথায় যুক্তি ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় পরাজিত হয়েছিল জার্মানি। জার্মান সৈন্য পৃথকভাবে আত্মসমর্পণ করেছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, গ্রেট ব্রিটেন ও ফ্রান্সের সেনাপতিদের কাছে। অন্য দিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান পরাজিত হয়ে আত্মসমর্পণ করেছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, গ্রেট ব্রিটেন, চীন, নেদারল্যান্ডস, আস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের কাছে পৃথক পৃথকভাবে। অন্য দিকে ১৯৭১-এ পাক বাহিনী কেবলই তদানীন-ন পূর্ব পাকিস্তানে আত্মসমর্পণ করেছিল এককভাবে ভারতীয় বাহিনীর কাছে। ভারত সে দিন বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর সেনাপতি জেনারেল মোহাম্মদ আতাউল গনি ওসমানীকে আসতে দেয়নি রমনার মাঠে। যে কারণেই হোক, তাকে আটকে রাখা হয়েছিল কুমিল্লার ক্যান্টনমেন্টে। ভারত কেন এটা করেছিল তার কোনো ব্যাখ্যা এখন পর্যন- পাওয়া যায়নি। আর এর ফলে ১৯৭১ সালে যুদ্ধ খাতাপত্রে পরিচিত হয়ে আছে কেবল ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হিসেবে। যদিও ১৯৭১ সালের যুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষের সাহায্য-সহযোগিতা ছাড়া পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধে কখনই ভারতের পক্ষে জেতা সম্ভব হতো না।
১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যে যুদ্ধ হয়, তাতে তদানীন-ন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ গ্রহণ করেনি পাকিস্তানের পক্ষ। ভারত কেবল লড়াই করেছে তার পশ্চিম রণাঙ্গনে। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে যে যুদ্ধ হয়, তা শেষ হয় ১৬ ডিসেম্বরে। ভারত একপক্ষীয়ভাবে ১৭ ডিসেম্বর ঘোষণা করে পশ্চিম পাকিস্তানের যুদ্ধবিরতি। ভারতের ব্রিগেডিয়ার আর এন মিশ্র যুদ্ধশেষে সাংবাদিকদের বলেন, মুক্তিবাহিনীর সহযোগিতা ছাড়া বাংলাদেশে যুদ্ধে জেতা সহজ হতো না। বাংলাদেশের মানুষ আমাদের নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন। তাই আমরা যুদ্ধে বিজয়ী হতে পেরেছি। বাংলাদেশের মানুষ আমাদের বলেছে কোথায় কিভাবে পাক বাহিনী যুদ্ধে অবস’ান নিয়েছে। তারা দিয়েছেন আমাদের গোপন সংবাদ। এসব সংবাদ যুদ্ধে ভারতীয় সৈন্যকে বিশেষভাবে সাহাষ্য করেছে। বাংলাদেশের মানুষ ভারতীয় সৈন্যকে করেছে খাদ্য সরবরাহ। নৌকা দিয়ে সাহায্য করেছে নদী পার হতে। তাদের সাহায্য-সহযোগিতা ভারতের সেনাবাহিনীকে দিয়েছে মনোবল, দিয়েছে গতি। আর তাই ভারতীয় সৈন্য মরেছে কম। অনেক সহজেই যুদ্ধ করতে পেরেছে পাক বাহিনীর সাথে। মিশ্রর এই বিবৃতি থেকে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে ১৯৭১ সালের লড়াইয়ের চেহারা। কিন’ পাক বাহিনী যেহেতু আত্মসমর্পণ করেছিল কেবল ভারতীয় সেনাদের হাতে, তাই যুদ্ধটা বিশ্ববাসীর কাছে এ সময় খ্যাত হয় কেবল পাক-ভারত যুদ্ধ হিসেবে। আর সিমলা চুক্তি সম্পন্ন হয় কেবল ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে। এতে বাংলাদেশ কোনো অংশ নিতে পারে না। কেন ১৯৭১-এর যুদ্ধে ভারত মুক্তিযুদ্ধের অধিনায়ককে রমনার ময়দানে আসতে দেয়নি সেটা আমরা বলেছি, এখনো আছে রহস্যময় হয়ে। তবে এর একটা কারণ হতে পারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাপ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৩ ডিসেম্বর তাদের বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ এন্টারপ্রাইজকে বাহরাইন থেকে পাঠায় বঙ্গোপসাগরে। অন্য দিকে ভিয়েতনাম থেকে পাঠায় তাদের সপ্তম নৌবহরের একাধিক জাহাজ। এ সময় আমি ছিলাম কলকাতায়। কলকাতায় মানুষকে বলতে শুনেছি, মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সন নাকি বলেছেন তদানীন-ন পূর্ব পাকিস্তানে যুদ্ধ থামাতে। না হলে মার্কিন সৈন্য অবতরণ করবে তদানীন-ন পূর্ব পাকিস্তানে। তারা ধরে নেবে পূর্ব পাকিস্তান হচ্ছে পাকিস্তানের অংশ। পাকিস্তানের সাথে আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গোপন সামরিক চুক্তি। যাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানকে প্রতিরক্ষার ব্যাপারে সাহায্য করতে বাধ্য। মার্কিন চাপ ১৯৭১- এর ডিসেম্বরের যুদ্ধকে প্রশমিত করেছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি পৃথক বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনে। তার ছিল ভিন্ন রকম পরিকল্পনা। সে ভেবেছিল বাংলাদেশে অনেক সহজে সে তার প্রভাব বিস্তার করতে পারবে। আর বাংলাদেশ হবে পাকিস্তানের চেয়ে তার অনুগত রাষ্ট্র। শেখ মুজিবুর রহমান রাজনীতি করেছেন মার্কিন সমর্থনে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাই ধরেই নিয়েছিল একটা পৃথক বাংলাদেশ হবে তার জন্য বিশেষ সহায়ক রাষ্ট্র; বৈরী রাষ্ট্র নয়। ১৯৭২ সালের ১৫ মার্চ বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনী স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করে। এর মূলেও ছিল মার্কিন চাপ। ভারত স্বেচ্ছায় বাংলাদেশ থেকে তার সৈন্য সরায়নি। মার্কিন চাপেই সে বাধ্য হয় সৈন্য সরিয়ে নিতে। এসব কথা শুনেছি, একাধিক লোকের মুখে, কলকাতা থেকে দেশে ফেরার পর।
আমি চাকরি করতাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে অনেক অধ্যাপকের কাছে অনেক কথা শুনেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলেন পাকিস্তানের সমর্থক অধ্যাপক। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থক অধ্যাপক। আর ছিলেন ভারতের সমর্থক অধ্যাপকও। নানা রকম আলোচনা শুনেছি বিশ্ববিদ্যালয় মহলে। এ থেকে যে ধারণা আমার মনে গড়ে উঠেছে, তা হলো ১৯৭১-এর যুদ্ধে শেষ পর্যন- থেকেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাপ খুবই প্রবলভাবে। ১৯৭১-এর যুদ্ধের গতি প্রকৃতিকে বিশ্লেষণ করতে হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দিয়ে করা যায় না। অন্য দিকে ১৯৭১-এ হয় সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ভারতের মধ্যে বিশেষ মৈত্রী চুক্তি। এই যুদ্ধে তদানীন-ন সোভিয়েত ইউনিয়নেরও ছিল বিশেষ ভূমিকা। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতকে যুদ্ধে সাহায্য করেছিল নেপথ্যে। প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার সোভিয়েত ইউনিয়নকে কথা দেয় যে, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হলে চট্টগ্রাম বন্দরে সোভিয়েত ইউনিয়ন পেতে পারবে নৌঘাঁটি গড়ার অধিকার; যদি সে সেটা চায়। চট্টগ্রাম বন্দর থাকবে সোভিয়েত নিয়ন্ত্রণে। সোভিয়েত নৌবাহিনীর জাহাজ ছিল দক্ষিণ ভারতের বিশাখাপত্তম বন্দরে। সোভিয়েত জাহাজ থেকে টর্পেডো ছুড়ে ডুবিয়ে দেয়া হয় পাকিস্তানের ডুবোজাহাজ গাজীকে। গাজী আসলে পাকিস্তানের জাহাজ ছিল না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এটা পাকিস্তানকে ধার দিয়েছিল ১৯৬৪ সালে। নৌযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়ন অংশ নিয়েছিল। রুশ সেনাপতিরা ১৯৭১-এ ভারতকে রণকৌশল গঠনে দিয়েছিল বিশেষ সাহায্য-সহযোগিতা। পাকিস্তানের যুদ্ধ কেবল হয়ে থাকেনি ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ। ১৯৭১-এর যুদ্ধ পরোক্ষভাবে হয়েছিল পাকিস্তান-সোভিয়েত যুদ্ধ। রণনীতিতে ভারতীয় সৈন্য উন্নত কৌশল প্রদর্শন করতে পেরেছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে আসা বিশেষজ্ঞদের কারণে। অর্থাৎ ১৯৭১-এর পাক- ভারত যুদ্ধ কেবল ভারত-পাকিস্তানের মধ্যকার যুদ্ধ ছিল না। এতে জড়িয়ে পড়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও। ইন্দিরা গান্ধী চাননি যুদ্ধ একটা বৃহত্তর
আন-র্জাতিক রূপ পরিগ্রহ করুক। ভারত তাই যুদ্ধকে সংক্ষিপ্ত করে। আর চায় না পাকিস্তানকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিতে। সে খুশি হয় সাবেক পাকিস্তানকে দ্বিখণ্ডিত করতে পেরেই। আজ যখন আমি ’৭১-এর যুদ্ধকে ফিরে দেখি, তখন এ রকমই মনে হয় আমার কাছে।
সিমলা চুক্তি নিয়ে বেশ কিছু আলোচনা করেছেন ভারতের একজন বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব পিলু মোদি (Piloo Mody)। পিলু মোদি একটা বই লেখেন ১৯৭৩ সালে। বইটির নাম Zulfi my Friend|। পিলু মোদি ছিলেন জুলফিকার আলী ভুট্টোর বাল্যবন্ধু। তিনি তার বইয়ে জুলফিকার আলী ভুট্টো সম্পর্কে অনেক কিছু লিখেছেন। অনেক কিছু লিখেছেন সিমলা সম্মেলন সম্পর্কে। যা থেকে পাওয়া সম্ভব ইতিহাস লেখার বেশ কিছু উপকরণ। পিলু মোদি হিন্দু সমপ্রদায়ভুক্ত ব্যক্তি নন। তিনি হলেন ভারতীয় পারসি (Parsi) ধর্ম সমপ্রদায়ভুক্ত ব্যক্তি। ভারতে পারসি সমপ্রদায় জনসংখ্যার দিক খেকে খুবই নগণ্য। কিন’ অর্থনীতি ও রাজনীতির ক্ষেত্রে এরা হলেন খুবই প্রতিপত্তিশালী। ভারতের সবচেয়ে বড় শিল্পপতি ছিলেন জমসেদজী টাটা (তাতা)। যিনি প্রতিষ্ঠা করে গেছেন টাটা কোম্পানি। ভারতের রাজনীতিতে পারসিরা রেখেছেন বিশেষ প্রভাব। ভারতের বিখ্যাত রাজনৈতিক দাদাভাই নৌরজি ছিলেন পারসি। নৌরজি প্রথম ভারতীয়দের মধ্যে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে নির্বাচিত হন। এটা ছিল সে সময় একটা বিরাট ঘটনা। মিনুমাসানি ছিলেন ভারতের একজন বিশিষ্ট সমাজতান্ত্রিক নেতা। তিনি তার লেখার মাধ্যমে ভারতীয় রাজনীতিতে রেখেছেন বিশেষ প্রভাব। ভারতের বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক হোমি জাহাঙ্গীর ভবা হলেন পারসি সমপ্রদায়ভুক্ত। মহাজাগতিক রশ্মি নিয়ে এর গবেষণা হয়ে আছে খুবই খ্যাত। ১৯৭১-এর যুদ্ধের সর্বাধিনায়ক এস এইচ এফ জে মানিক শ (পরে মার্শাল) ছিলেন পারসিক সমাজভুক্ত। পিলু মোদি ছিলেন ভারতীয় পার্লামেন্টের সদস্য এবং ভারতীয় স্বতন্ত্র দলের একজন খুবই নামকরা নেতা। ১৯৭২ সালে যখন সিমলা সম্মেলন হচ্ছিল তখন তিনি যান সিমলায়। দেখা করেন ভুট্টোর সাথে। তিনি তাকে দেন বহুবিধ পরামর্শ। এ রকম করাটা তার পক্ষে সম্ভব হয়েছিল তার বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের কারণেই। ইন্দিরা গান্ধী তাকে বিরত রাখতে পারেননি ভুট্টোর সাথে দেখা ও উপদেশ প্রদান করা থেকে। অন্য কোনো ব্যক্তি হলে তাকে চিহ্নিত হতে হতো ভারতীয় আইনানুসারে দেশদ্রোহী হিসেবে। কিন’ পিলু মোদিকে তা হতে হয়নি। পিলু মোদি তার বইয়ে বলেছেন- ইন্দিরা গান্ধী সিমলা সম্মেলনে ওঠান যুদ্ধবন্দীদের মধ্যে কিছুসংখ্যক ব্যক্তিকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিচার করার প্রসঙ্গটি। জুলফিকার আলী ভুট্টো বলেন, এতে তার আপত্তি নেই। কিন’ বিচার হতে হবে জেনেভা কনভেনশন অনুসারে। জেনেভা কনভেনশন অনুসারে যুদ্ধবন্দী হত্যা হলো অন্যতম যুদ্ধাপরাধ। জেনেভা কনভেনশনানুসারে যুদ্ধবন্দীকে হত্যা করা যায় না। কিন’ পূর্ব পাকিস্তানে ইপিআর তাদের হাতে ধরা পড়া পাক বাহিনী সৈন্যকে বন্দী অবস’ায় হত্যা করেছে। জেনেভা কনভেনশনানুসারে হতে হবে তাদের বিচার। পিলু মোদি তার বইয়ে বলেছেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথা উঠতে পারত কাদেরিয়া বাহিনী সম্পর্কে। কাদেরিয়া বাহিনীর নেতা কাদের সিদ্দিকী অমানবিকভাবে নির্বিচারে বিহারি হত্যা করেছেন। সেটাও পড়তে পারে যুদ্ধাপরাধেরই মধ্যে। ইন্দিরা গান্ধী তাই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পর্কে আর বেশি দূর অগ্রসর হতে চাননি। কারণ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে গেলে দেখা দিত সমূহ জটিলতা। যুদ্ধাপরাধ ঘটেছে দুই পক্ষ থেকেই। এক পক্ষ থেকে নয়।
আন-র্জাতিক নিয়মে করতে হতো যুদ্ধাপরাধের বিচার। আর আন-র্জাতিক নিয়মে বিচার হলে, বিচারে পাকিস্তান পেতে পারত অধিক সুবিধা। এ কথা বলেছেন, পিলু মোদি তার লেখা Zulfi my Friend বইয়ে। পিলু মোদির মতে, জুলফিকার আলী ভুট্টো ও শেখ মুজিবের মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধ ছিল যথেষ্ট গভীর। জুলফিকার আলী ভুট্টো ছিলেন বিশেষভাবেই দ্বিজাতিতত্ত্বে বিশ্বাসী। জুলফিকার আলী ভুট্টো ছিলেন সিন্ধি। কিন’ তিনি কখনোই তোলেননি সিন্ধি জাতীয়তাবাদের ধ্বনি। কিন’ শেখ মুজিব চেয়েছেন পাকিস্তানের মধ্যে থেকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ধ্বনি তুলে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে। জনাব ভুট্টো মেনে নিতে পারেননি পাকিস্তানে বাঙালি জাতীয়তাবাদকে। তিনি মনে করেন বাঙালি জাতীয়তাবাদ দেবে সাবেক পাকিস্তানকে দ্বিখণ্ডিত করে। পরবর্তী ঘটনা ভুট্টোর ধারণাকে, পিলু মোদির মতে, যথার্থ প্রমাণ করেছে।
সিমলা চুক্তি অনুসারে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গ আর ওঠা উচিত ছিল না। কিন’ এখন নতুন করে উঠছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গ। এর একটি কারণ, বিশ্বরাজনীতির ধারা বিশেষভাবেই বদলে গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এক সময় তার পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করেছে কমিউনিজম রোধের লক্ষ্য সামনে রেখে। এখন তাকে পেয়ে বসেছে জঙ্গি ইসলাম আতঙ্কে। বর্তমানে বাংলাদেশে যাদের যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিচার করা হচ্ছে তাদের প্রায় সবাই সাধারণভাবে পরিচিত ইসলামপন’ী হিসেবে। ১৯৭১ সালে এরা সবাই ছিলেন অত্যন- তরুণ। এরা কতটা যুদ্ধাপরাধের সাথে জড়িত ছিলেন সেটা তর্কের বিষয়। শেখ মুজিব চাননি এদের বিচার করতে। কিন’ এখন এদের উঠতে হচ্ছে বিচারের কাঠগড়ায়। মনে হচ্ছে, সারা দেশে অনেক যুদ্ধাপরাধী আছে। আর তারা হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের রাজনীতির প্রধান সমস্যা। কয়েক মাস আগে বাংলাদেশে এসেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। মনমোহন সিং বাংলাদেশে সফরে আসার ঠিক আগে দিয়ে বলেন যে, বাংলাদেশ ভরে উঠেছে মুসলিম মৌলবাদে। মুসলিম মৌলবাদী দল জামায়াতে ইসলামীকে সমর্থন করে বাংলাদেশের শতকরা ২৫ ভাগ মানুষ। পরে তিনি তার এই বক্তব্যকে প্রত্যাহার করে নেন। মনে হচ্ছে জামায়াতকে ধ্বংস করার লক্ষ্যে বিশেষ করে উঠানো হচ্ছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রসঙ্গটি। এ ক্ষেত্রে আছে ভারতেরও একটি ভূমিকা। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন লাভের আশায় উদ্যোগ নিয়েছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের। অথচ ১৯৭২-এর সিমলা চুক্তি অনুসারে এ রকম বিচার অনুষ্ঠান হওয়া উচিত ছিল না। সিমলা চুক্তির কোনো মূল্য এখন আর নেই।
লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট
॥ গোলাপ মুনীর ॥

বিতর্কিত ও অসাংবিধানিক এক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আয়োজিত বিতর্কিত এক নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বর্তমান সরকার আজ বাংলাদেশের শাসনক্ষমতায় আসীন। এরই মধ্যে এ সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদের প্রায় তিন বছর শেষ। এই তিন বছর মেয়াদে সরকার দেশবাসীকে উপহার দিয়েছে নানা আলোচিত ব্যর্থতা- নির্বাচনী ওয়াদা পালনে ব্যর্থতা, প্রতিশ্রুত কর্মসংস’ান সৃষ্টিতে ব্যর্থতা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা, সিন্ডিকেট দমনে ব্যর্থতা, শেয়ারবাজারের ধস ঠেকাতে ব্যর্থতা, অর্থনীতির খাতে খাতে ব্যর্থতা, দিন বদলের সহিষ্ণু রাজনীতি অনুশীলনে ব্যর্থতা, জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করায় ব্যর্থতা, জাতীয় বিভাজন কমানোর পরিবর্তে বরং বিভাজন বাড়িয়ে তোলার ব্যর্থতা, সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থতা, যুদ্ধাপরাধী বিচার ট্রাইব্যুনালের নিরপেক্ষতা বজায় রাখায় ব্যর্থতা, চাঁদাবাজি-টেন্ডাবাজি-দখলবাজি-দলবাজি ঠেকাতে ব্যর্থতা, দেশের স্বার্থ রক্ষায় ব্যর্থতা, প্রতিবেশী দেশের কাছ থেকে বাংলাদেশের ন্যায্য অধিকার আদায়ে ব্যর্থতা ও কূটনীতিতে সীমাহীন ব্যর্থতাসহ এমনি আরো নানামাত্রিক ব্যর্থতা। সরকারের নানামাত্রিক এসব ব্যর্থতার সূত্র ধরে সরকারের জনপ্রিয়তার মাত্রা এখন একেবারে তলানিতে এসে নেমেছে বলেই মনে হয়। ফলে বিভিন্ন মহল থেকে আসছে সরকারের কঠোর সমালোচনা। দেয়া হচ্ছে নানা ধরনের পরামর্শ। কিন’ সরকার তাতে একেবারেই কান দিচ্ছে না। সরকার চলছে নিজের মতো করেই। এক ধরনের চরম একগুঁয়েমি সরকারকে পেয়ে বসেছে। কে কী বলল, কোনো পরোয়া নেই। জনমত কোন দিকে তা-ও বিচেনার বিষয় নয়। মনে হচ্ছে, সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েই বসেছে, যা করব জনমত উপেক্ষা করেই করব। কেউ যদি বলে, ‘সামনে রেড সিগন্যাল, একটু থামো’। তখন এই রেড সিগন্যাল না মানার জেদ যেন সরকারের মাথায় আরো বেশি করে চেপে বসে। মনোভাবটি যেন এমন- ‘সামনে বাড়ব, রেড সিগন্যাল পায়ে দলব’। এ ধরনের মনোভাব নিয়ে চলা সরকারের এই তিন বছরের শাসনামল দেখে মনে হচ্ছে, সরকার যেন রেড সিগন্যাল না মানা ট্রেনে চেপে বসেছে।
এর সর্বসাম্প্রতিক উদাহরণ হচ্ছে, ঢাকা সিটি করপোরেশনকে দুই ভাগ করে গত ২৯ নভেম্বর সংসদে ‘স’ানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) সংশোধনী বিল, ২০১১’ পাস করা। সংসদে কোনো আলোচনা ছাড়াই মাত্র চার মিনিটে এই বিল পাস করার মধ্য দিয়ে দু’ভাগ হয়ে গেল ৪০০ বছরের ঢাকা। উত্তর ঢাকা ও দক্ষিণ ঢাকা। রাজনৈতিক হীন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে ঢাকার এই অর্থহীন বিভাজনে ক্ষুব্ধ ঢাকাবাসী, নাগরিক সাধারণ, সুশীলসমাজ, ঢাকা সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী, স’ানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও বিরোধী দলগুলো। সরকারের এ উদ্যোগে দেশবাসী রীতিমতো বিস্মিত। তাদের মনে প্রশ্ন- এমনটি করতে হবে, এমন দাবি তো কেউ তুলেনি- তবে কেন এ বিভাজন? এর পেছনে কি সরকারে কোনো হীন উদ্দেশ্য কাজ করছে? জনমনে এমন প্রশ্ন জাগা খুবই স্বাভাবিক।
বিভিন্ন মহলের প্রবল সমালোচনা উপেক্ষা করে সংসদে নিছক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে এ বিল পাস করা জনমত উপেক্ষার একটি ধ্রুপদ উদাহরণ হয়ে থাকবে বাংলাদেশের ইতিহাসে। বলতে গেলে ঢাকা বিভাজনের এই উদ্যোগের বিরুদ্ধে গোটা দেশের মানুষ। ঢাকার কোনো সাধারণ নাগরিককে পাওয়া যায়নি এই উদ্যোগ সমর্থন করতে। সচেতন নাগরিক সমাজ এর বিরুদ্ধে নানা কর্মসূচি পালন করছে। এরা এই বিল পাস হওয়ার পর তা বাতিলে আরো কঠোর কর্মসূচি ঘোষণার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। ঢাকা সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ঐক্যবদ্ধভাবে ঘোষণা দিয়েছে এই বিভাজন বাতিল না করলে ঢাকা অচল করে দেয়ার কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। আন্দোলন ঠেকাতে সরকারের বদলি ও চাকরিচ্যুতির নীতি পরিসি’তিকে আরো সঙ্ঘাতময় করে তুলেছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নেতারা বলেছেন, এই নীতি অবলম্বন করে সরকার একজনকেও বদলি কিংবা চাকরিচ্যুতি করলে সব কিছু অচল করে দেয়া হবে। নাগরিক সমাজ বলছে, ঢাকা বিভাজনকে তারা মেনে নেবেন না। তা করা হলে তারা আরো কঠোর আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে এই বিভাজন উদ্যোগ থেকে ফেরাতে বাধ্য করবেন।
কোন উদ্দেশ্যে এই জনবিরোধী পদক্ষেপ? নির্বাচিত মেয়রকে এভাবে সরিয়ে দিয়ে ঢাকাকে দুই ভাগ করে সরকারের পছন্দমতো অনির্বাচিত প্রশাসক নিয়োগের পেছনে সরকারে ক্ষুদ্র দলীয় সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে বলে জনেমনে প্রবল ধারণা। দেশের সুশীলসমাজের বিশিষ্টজনদের মতে, এই ভাগ প্রক্রিয়া পুরোপরি অগণতান্ত্রিক,অর্থহীন, ঝুঁকিপূর্ণ ও সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। সরকার এই পদক্ষেপের সুস্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে শুধু বলছে, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে নাগরিক সুবিধা বাড়ানোর জন্য সরকারের এই উদ্যোগ। কিন’ সরকারের এ ব্যাখ্যা কেউ আমলে নিতে পারছেন না। কারণ, এ সরকার যে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের চেয়ে ক্ষমতা কুক্ষিগত করায়ই বেশি আগ্রহী, তার বড় প্রমাণ নির্বাচিত উপজেলা পরিষদকে দীর্ঘ দিন ধরে ক্ষমতাহীন করে রাখার সরকারের নানমাত্রিক তৎপরতা। বিষয়টি এখন ওপেন সিক্রেট। উপজেলা পরিষদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সরকারের এই অপতৎপরতার বিরুদ্ধে আন্দোলন করে আসছেন। আন্দোলনের চাপের মুখে উপজেলা পরিষদ আইনের যে সংশোধনী পাস করা হলো গত ২৯ নভেম্বর, তাতেও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দাবির প্রতিফলন ঘটেনি। এক দিকে সরকার নিজেকে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার বলে দাবি করছে, অপর দিকে ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাচিত মেয়রকে সরিয়ে নিজেদের পছন্দমতো অনির্বাচিত প্রশাসক বসিয়ে তার অধীনে নির্বাচন করার হীন উদ্দেশ্য নিয়ে আইন সংশোধন করেছে। তা-ও আবার প্রবল জনমতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে। সে জন্যই যথার্থ যৌক্তিক কারণে দেশবাসীর কাছে সরকারের এ উদ্যোগ সঙ্কীর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণীত ও অগণতান্ত্রিক বলেই বিবেচিত।
এ প্রসঙ্গে যৌক্তিক প্রশ্ন তুলেছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নবনির্বাচিত মেয়র ডা: সেলিনা হায়াত আইভী। তিনি বলেছেন, এক দেশে দুই আইন চলতে পারে না। তত্ত্বাবধায়ক সরকার অনির্বাচিত, অতএব অগণতান্ত্রিক- তাই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজন গণতন্ত্রসম্মত নয়। এই যুক্তি দেখিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস’া বাতিল করা হচ্ছে। অপর দিকে নির্বাচিত মেয়র সাদেক হোসেন খোকাকে সরিয়ে সেখানে অনির্বাচিত প্রশাসক বসিয়ে তার অধীনে নির্বাচন করার ব্যবস’া পাকাপোক্ত করা হচ্ছে। এ হচ্ছে এক দেশে দুই আইনের উদাহরণ। এক দেশে দুই আইন চলতে পারে না। আর নির্বাচিত মেয়র সাদেক হোসেন খোকাকে এভাবে বিদায় দিয়ে সরকার ঠিক করেনি। তার প্রশ্ন- তত্ত্বাবধায়ক সরকার যদি বাতিল হয়, তবে কেন নির্বাচিত মেয়র অনির্বাচিত প্রশাসকের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে? নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনে উন্নীত হওয়ার পর ডা: আইভীকেও এভাবে গত ২৭ জুন অনির্বাচিত প্রশাসকের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে চলে যেতে হয়েছিল, যা সঠিক প্রক্রিয়া ছিল না। তেমনি সাদেক হোসেন খোকাকে সরানো হয়নি সঠিক প্রক্রিয়ায়।
ঢাকা বিভাজনের এই প্রক্রিয়াটি সংবিধানের সাথেও সাংঘর্ষিক বলে কথা তুলেছেন সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞজনেরা।
আমাদের সংবিধানের পঞ্চম অনুচ্ছেদে সুস্পষ্টভাবে দু’টি বিষয় বলা আছে : ০১. প্রজাতন্ত্রের রাজধানী হবে ঢাকা। এবং ০২. রাজধানীর সীমানা নির্ধারিত হবে আইনের মাধ্যমে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের রাজধানী হবে কোন ঢাকা? উত্তর ঢাকা না দক্ষিণ ঢাকা? সংবিধান সংশোধন না করে এ জটিলতা কাটানো যাবে না। তা না হলে সিটি করপোরেশন বিভাজনের এই আইন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে থাকবে।
আর সংবিধানের ৫৯ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা আছে স’ানীয় সরকারের আকার ও সুযোগ প্রসঙ্গে। অনুচ্ছেদটি নিম্নরূপ :
“অনুচ্ছেদ ৫৯ : স’ানীয় সরকার
(১) আইনানুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক একাংশের স’ানীয় শাসনের ভার প্রদান করা হবে।
(২) এই সংবিধান ও অন্য কোনো আইন সাপেক্ষে সংসদ আইনের দ্বারা যেরূপ নির্দিষ্ট করিবেন, এই অনুচ্ছেদের (১) দফায় উল্লিখিত অনুরূপ প্রত্যেক প্রতিষ্ঠান যথোপযুক্ত প্রশাসনিক একাংশের মধ্যে সেইরূপ দায়িত্ব পালন করিবেন এবং অনুরূপ আইনে নিম্নলিখিত বিষয়সংক্রান্ত দায়িত্ব অন্তর্ভুক্ত হইতে পারিবে :
(ক) প্রশাসন ও সরকারি কর্মকর্তাদের কার্য;
(খ) জনশৃঙ্খলা রক্ষা;
(গ) জনসাধারণের কার্য ও অর্থনৈতিক উন্ন্য়ন সম্পর্কিত পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন।”
সংবিধানের এই ধারা দৃষ্টে বিশেষজ্ঞদের অভিমত, কোনো সিটি করপোরেশনের নির্বাচিত মেয়রকে সরিয়ে অনির্বাচিত প্রশাসক নিয়োগের কোনো সুযোগ নেই। স্পষ্টত, ৫৯ নম্বর অনুচ্ছেদটির (১) নম্বর দফায় সংবিধান তো আমাদের এই নির্দেশই দেয়, স’ানীয় সরকারের প্রশাসনিক ইউনিটের শাসনের দায়িত্বভার ন্যস্ত করতে হবে আইনানুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানের ওপর। অতএব নির্বাচিত মেয়রকে সরিয়ে অনির্বাচিত প্রশাসক নিয়োগ যে সংবিধানের পরিপন’ী, তা বুঝতে সংবিধান বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না।
বিশিষ্টজনদের মতে, ঢাকার এই বিভাজনকে সম্পূর্ণ সংবিধানবহির্ভূত, অর্থহীন ও অগণতান্ত্রিক। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, যে যুক্তিতে ঢাকা সিটি করপোরেশন ভাগ করা হয়েছে, তা ঠিক নয়। তার মতে, নাগরিক সেবার মান বাড়াতে হলে প্রশাসনকে বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। এর জন্য ঢাকাকে দুই ভাগে ভাগ করার কোনো প্রয়োজন নেই। ঢাকাকে বিভক্ত করার মধ্য দিয়ে নানা সমস্যার সৃষ্টি হবে। আমি বলব, সিদ্ধান্তটি অপচয়মূলক, ক্ষতিকর ও সংবিধানবিরোধী। বিভিন্ন বড় শহরে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ হয়েছে, বিভক্তির কোনো নজির নেই।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান বলেছেন, কোনো লাভ-ক্ষতির হিসাব না করেই ঢাকার এই বিভাজন করা হয়েছে। এই বিভক্তিতে কোনো লাভ নেই। এতে প্রশাসনিক খরচ বাড়বে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমন্বয়হীনতা দেখা দেবে। বৈদেশিক ঋণ ও বণিজ্যিক ঋণ পেতে অসুবিধা হবে। দেনার ভাগ নিয়ে জটিলতা হবে। আয় বৈষম্য দেখা দেবে। দুই সিটি করপোরেশনের সীমানায় উন্ন্‌য়নকাজে জটিলতা দেখা দেবে। রিকশার লাইসেন্স দেয়া ও রিকশা চলার এলাকা নিয়ে সমস্যা হবে। সর্বোপরি এ সিদ্ধান্ত সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক।
স’ানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, সরকার রাজনৈতিকভাবে একটি ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর খেসারত দেবে জাতি। সিটি করপোরেশন ভাগ নয়, প্রয়োজন এর উন্নয়নের জন্য সংস্কার। এ কাজটি করে সরকার বড় ধরনের একটি ঝুঁকি নিয়েছে। এর কোনো প্রয়োজন ছিল না। দুই করপোরেশনের জন্য জনবল ও সম্পদ বণ্টন কঠিন হবে। সেবার মান বাড়ানোর যে কথা বলা হচ্ছে, তা নির্ভর করে প্রশাসনিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর। স’ানীয় সরকারের গণতন্ত্রায়নের জন্য আইনের সংস্কার প্রয়োজন। তা না করে যা করা হলো, তা অগণতান্ত্রিক। একটি নগরে একাধিক সিটি করপোরেশনের কথা আমি কোথাও শুনিনি।
গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন বলেছেন, ঢাকাকে দুই ভাগ করার মাধ্যমে ঢাকার ঐতিহ্য ভাগ করার চেষ্টা চলছে। এর প্রতিবাদে ঢাকাবাসী আন্দোলনে নেমেছেন। প্রয়োজনে ১৬ কোটি মানুষ আন্দোলনে নেমে প্রতিবাদ জানাবে।
আওয়ামী লীগ নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, আমি দল করি। কিন’ দলবাজি করি না। দলের অন্যায় সিদ্ধান্ত মেনে নিই না। যেমন মানিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস’া বাতিলের সিদ্ধান্ত ও ঢাকা ভাগের সিদ্ধান্ত।
ব্র্যাক স্কুল অব ল’-এর প্রধান ও আইনজীবী ড. শাহদিন মালিক বলেন, ঢাকার এই বিভক্তির ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র দলীয় ও সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক কারণ আছে। এ প্রক্রিয়ার তিনটি দিক আছে। একটি হলো এর গণতান্ত্রিক দিক। দ্বিতীয়টি প্রশাসনের সুযোগ-সুবিধার দিক। আর তৃতীয়টি হলো রাজনৈতিক। পুরো প্রক্রিয়া খুব তাড়াহুড়ো করে করা হয়েছে। প্রথমে মন্ত্রিপরিষদে সিদ্ধান্ত হলো। তড়িঘড়ি করে বিল হলো। কমিটিতে গেল। কমিটি কোনো পরিবর্তন ছাড়াই রিপোর্ট দিলো। এরপর বিল সংসদে পাস হয়ে গেল। এত বড় একটা সিদ্ধান্ত এভাবে না করে নানা দিক খতিয়ে দেখার প্রয়োজন ছিল। তা না করে হুট করে তা জনগণের ওপর চাপিয়ে দেয়া হলো। গণতান্ত্রিক দেশে কোনো বড় সিদ্ধান্ত নিতে হলে জনগণকে জানিয়ে, তাদের সন’ষ্ট করে জনমত গঠন করে তা করা হয়। আমাদের এখানে বিষয়টি হচ্ছে, তারা তা করে দেবেন, আর ছলেবলে জনগণকে বাধ্য করা হবে তা মেনে নিতে- জনমত এর বিরুদ্ধে যত প্রবলই হোক।
আসলে জনগণ যতই বলুক ‘সামনে রেড সিগন্যাল’। সে রেড সিগন্যাল না মানাই যেন আওয়ামী লীগ সরকারের কাজ। আর এ জন্য খেসারত দিতে হয় গোটা জাতিকে। সে উদাহরণ তো আওয়ামী লীগ সরকার বরাবর রেড সিগন্যাল না মেনে চলার নানা পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে তৈরি করে রেখেছে। জনমতের বিরুদ্ধে গিয়ে বাকশাল ব্যবস’া চালু, ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা এগিয়ে আনা, আঁড়িয়াল বিলে এই সময়ে অপ্রয়োজনে বঙ্গবন্ধুর নামে বিপুল অর্থব্যয়ে একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণে সরকারের মরিয়া চেষ্টা, জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নাম পরিবর্তন, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় মূল্যবোধে আঘাত দিয়ে সংবিধানের ব্যাপক পরিবর্তন, সঙ্কীর্ণ দলীয় স্বার্থতাড়িত হয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস’া বাতিল, সর্র্র্র্র্র্বোপরি জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে ঢাকা ভাগ করে নতুন নতুন সমস্যা সৃষ্টি করা তো আওয়ামী লীগের সিগন্যাল না মেনে চলা এমনি কিছু পদক্ষেপেরই উদাহরণ। কিন’ রেড সিগন্যাল না মানার জেদ নিয়ে চললে পরিণামে ইচ্ছার বিরুদ্ধে একবার থামতে তো হয়ই।
সরকারের এই রেড সিগন্যাল না মেনে চলার প্রবণতা দেখে দেশে প্রচলিত একটি গল্পের কথা মনে পড়ে গেল। দুই গ্রামবাসীর মধ্যে ঝগড়া- একজন বলছে, সিংহ বাচ্চা প্রসব করে। অপর জন বলছে, সিংহ ডিম পাড়ে। দু’জনই নিজের দাবিতে অটল। কিছুতেই মীমাংসা হচ্ছে না। অবশেষে উভয়ে একমত- সমাধানের জন্য তারা যাবে কোনো বোদ্ধাজনের কাছে। হলোও তাই। বোদ্ধাজন তো আসলেই বোদ্ধা। সব কথা শুনে তিনি দু’জনের কাছেই প্রশ্ন রাখলেন, আচ্ছা বল তো সিংহ কী? উভয়ের উত্তর- ’সিংহ পশুর রাজা’। বোদ্ধাজন এবার বললেন, তা হলে তোমরা বলছ, সিংহ পশুর রাজা। আর তোমরা এ-ও জান রাজার ইচ্ছায় কর্ম। অতএব পশুর রাজা সিংহের যা ইচ্ছা তাই হবে। সিংহ চাইলে বাচ্চা প্রসব করবে, আর চাইলে ডিম দেবে। তাতে তোমাদের কী?
আসলে আমাদের দেশের রাজা এখন আওয়ামী লীগ। রাজার ইচ্ছায় চলবে সব কর্ম। তাতে কার কী বলার আছে। জনগণ আবার কে। চাইলে ৪০০ বছরের ঢাকাকে চার মিনিটে ভাগ করবে। আবার মনে চাইলে কয় মিনিটে এক করবে। চাইলে দেশে মিনিট কয়েকে একদলীয় বাকশাল কায়েম করবে। বেসরকারি মালিকানায় সব পত্র-পত্রিকা প্রকাশ বন্ধ করে দেবে। চাইলে গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস’া কায়েমের জন্য দেশ অচল করে দেয়ার আন্দোলনে নামবে। চাইলে সবার মত অগ্রাহ্য করে অগণতান্ত্রিক আখ্যা দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস’া বাতিল করবে। প্রয়োজনে এ জন্য সামনে নিয়ে আসবে নানা অজুহাত। চাইলে জনমতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আঁড়িয়াল বিলে অপ্রয়োজনীয় নতুন বিমানবন্দর নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেবে, আর জনমতের চাপের মুখে সে সিদ্ধান্ত বাতিল করবে- তাতে কার কী বলার আছে। আর সরকার যখন রেড সিগন্যাল না মেনে চলার ট্রেনে চেপেই বসেছে, তখন এমনটি তো হবেই। জনমতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বিতর্কিত-আলোচিত-সমালোচিত অগণতান্ত্রিক-অসাংবিধানিক ঢাকা বিভাজনও চলবে। তাতে কার কী বলার আছে?

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: